ইলমে দ্বীনের ফযীলত

Spread the love

ইলমে দ্বীনের ফযীলত
পটভূমিঃ
প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির একথা জেনে রাখা ওয়াজিব যে ইলম শব্দটি যখন সাধারণভাবে আসবে এবং শরী’আতের দলীলাদি তার ফযীলতে বিধৃত হবে তখন মনে করতে হবে যে ইহা দ্বারা শরঈ ইলম উদ্দেশ্য, কাজেই তা থেকে অন্যান্য সকল ইলম বহির্ভূত বলে গণ্য হবে।[৬]
(হাফেয) ইবনু হাজার (রহ.) ফাতহুলবারীতে বলেনঃ
وَالْمُرَاد بِالْعِلْمِ الْعِلْم الشَّرْعِيّ الَّذِي يُفِيد مَعْرِفَة مَا يَجِب عَلَى الْمُكَلَّف مِنْ أَمْر عِبَادَاته وَمُعَامَلَاته ، وَالْعِلْم بِاَللَّهِ وَصِفَاته ، وَمَا يَجِب لَهُ مِنْ الْقِيَام بِأَمْرِهِ ، وَتَنْزِيهه عَنْ النَّقَائِض ، وَمَدَار ذَلِكَ عَلَى التَّفْسِير وَالْحَدِيث وَالْفِقْه (فتح الباري ১/১৪১).
ইলমে শরঈ দ্বারা উদ্দেশ্য হল এমন ইলম যা ঐসব ধর্মীয় বিষয় জানার ফায়েদা দিয়ে থাকে যা একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব। যেমন ইবাদত, লেনদেন, আল্লাহ্ ও আল্লাহর গুণাবলী সংক্রান্ত ইলম, অনুরূপভাবে তার জন্য যা যা করা ওয়াজিব যেমন তাঁর আদেশ পালন, তাঁকে যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যূতি থেকে পবিত্র করণ মর্মের ইলম। আর এই ইলমের ভিত্তি হল তাফসীর, হাদীছ ও ফিক্বহ্ প্রভৃতি (ফাতহুলবারী ১/১৪১)।
ইলমের ফযীলত মর্মে কিছু দলীল
আল্লাহর কিতাব- আল্ কুরআন থেকে:
১-মহান আল্লাহর বাণী –
(أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِداً وَقَائِماً يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ)[الزمر:৯]
‘যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সাজদাহ্র মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, পরকালের ভয় করে এবং তার প্রতিপালকের রহমতের আশা করে সে কি তার সমান যে এরূপ করে না? আপনি বলুন: যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? উপদেশ তো কেবল তারাই গ্রহণ করে যারা বুদ্ধিমান। ‘(সূরা আয্ যুমার : ৯)।
২-মহান আল্লাহর বাণীঃ
(يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ)[المجادلة:১১]
‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞান প্রাপ্ত, আল্লাহ্ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন।’ ( সূরা আল্ মুজাদিলাহ্ : ১১)
৩-মহান আল্লাহর বাণীঃ
(شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِماً بِالْقِسْطِ)[آل عمران:১৮]
‘আল্লাহ্ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ব্যতীত প্রকৃত কোনই উপাস্য নেই। (একই বিষয়ে) ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ আলেমগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৮)
ইলমের ফযীলত সম্পর্কে হাদীছ থেকে দলীলঃ
১-রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীঃ
(إِنَّ طَالِبَ الْعِلْمِ لَتَحُفُّهُ الْمَلَائِكَةُ وَتُظِلُّهُ بِأَجْنِحَتِهَا ثُمَّ يَرْكَبُ بَعْضُهُمْ بِعْضًا حَتَّى يَبْلُغُوْا السَّمَاءَ الدُّنْيَا مِنْ حُبِّهِمْ لِمَا يَطْلُبُ)[قال المنذري: رواه أحمد والطبراني بإسناد جيد واللفظ له، وابن حبان في صحيحه والحاكم، وقال: صحيح الإسناد، وروى ابن ماجة نحوه باختصار، مختصر الترغيب والترهيب، فضل الرحلة في العلم، رقم الحديث (৪০) ورواه الطبراني في الكبير ورجاله رجال الصحيح/ قلتُ:-وأنا أختر- وأخرجه أيضاً الضياء المقدسي في الأحاديث المختارة برقم ৩৪، ৩৫].
‘নিশ্চয় ইলম অর্জনকারীকে ফেরেশতাগণ চতুর্পাশ থেকে বেষ্টন করেন ও নিজ পাখা দিয়ে ছায়া দান করেন। এবং তারা একে অপরের উপর আরোহণ করতঃ আসমান পর্যন্ত পৌঁছে যান। তার ইলম অর্জনের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শনস্বরূপ তারা এমনটি করেন। [ইমাম মুনযিরী বলেনঃ হাদীছটি আহমাদ, ত্বাবারানী বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন। হাদীছটির শব্দ তাবারানীর। আরও বর্ণনা করেছেন ইবনু হিব্বান নিজ ছহীহতে এবং হাকেম এটিকে-মুস্তাদরাকে -বর্ণনা করার পর বলেন: এটির সনদ ছহীহ। ইবনু মাজাহ প্রায় অনুরূপ হাদীছ সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। মুখতাছারুত্ তারগীবি ওয়াত্ তারহীব, ইলমের জন্য সফর করা অধ্যায়, হা/৪০, এটিকে তাবারানী তার আল্ মুজামুল কাবীর গ্রন্থে বর্ণনা করেন,তার এই বর্ণনার সকল সুত্র ছহীহ (বুখারী ও মুসলিম) এর বর্ণনাকারী। হাদীছটি যিয়া মাক্বদিসী তাঁর ‘আল্ আহাদীছুল মুখতারাহ্’ নামক বিশুদ্ধ হাদীছ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। দ্রঃ আল্ আহাদীছ্ আল্ মুখতারাহ্,হা/৩৪,৩৫]।
২-রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীঃ
(مَا مِنْ رَجُلٍ يَسْلُكُ طَرِيْقاً يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا إِلاَّسَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ ، وَمَنْ أَبْطَأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ حسَبُهُ) [رواه مسلم بزيادة في أوله وآخره، كتاب الذكر والدعاء، باب فضل الاجتماع على تلاوة القرآن وعلى الذكر، رقم الحديث ৩৮، وأخرجه أبو داود بهذا اللفظ- كتاب العلم-باب الحث على طلب العلم، رقم الحديث ৩৬৪৩].
‘যদি কোন ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ কল্পে কোন পথে পরিচালিত হয় তাহলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সুগম-সহজ করে দেন। আর যার আমল নিজেকে ধীর গতি সম্পন্ন করেছে তাকে তার বংশীয় মর্যাদা এগিয়ে দিতে পারবে না। তথা আমলে পিছিয়ে থাকলে বংশীয় মর্যাদার গুণে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারবে না। (মুসলিম,প্রথমে ও পরে বর্ধিত অংশ সহ, যির্ক ও দু’আ অধ্যায়,হা/৩৮, আবুদাউদ এই শব্দে সংকলন করেছেন। দেখুনঃ আবুদাঊদ ইলম অধ্যায়,হা/৩৬৪৩)।
৩-রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীঃ
( إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَة أَشْيَاءَ: مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ) [رواه مسلم ، كتاب الوصية، باب ما يلحق الإنسان من الثواب بعد وفاته، حديث رقم ১৬৩১]
‘মানুষ যখন মৃত্যু বরণ করে তখন তার আমল তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তবে তিনটি বস্তুর কথা ভিন্ন (সেগুলির নেকী কর্তিত হয় না)। প্রবাহ মান-স্থায়ী সদকা, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, এমন সৎ সন্তান যে তার জন্য দু’আ করে।’ (মুসলিম, ওছিয়্যত অধ্যায়, হা/১৬৩১)।
৪-রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীঃ
(فَضْلُ الْعِلْمِ خَيْرٌ مِنْ فَضْلِ الْعِبَادَةِ وَخَيْرُ دِيْنِكُمُ الْوَرْعُ).
‘ইলমের অতিরিক্ততা, ইবাদতের অতিরিক্ততা অপেক্ষা উত্তম- আর দ্বীনের মূল ও মৌলিক বিষয় হল তাক্বওয়া-আল্লাহভীতি (বায্যার এটিকে হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন,ত্বাবারানী আল্ আওসাত গ্রন্থে সংকলন করেছেন। হাকেম এটিকে এই শব্দে ‘আর তোমাদের ধর্মের উত্তম বিষয় হল তাক্বওয়া-আল্লাহভীতি, হাকেম,ইলম অধ্যায়,হা/৩১৪। এটিকে হাকেম ছহীহ বলেছেন, যাহাবী তাঁর সমর্থন করেছেন। এবং আলবানী রহ. এটিকে ছহীহুল জামে’ গ্রন্থে হা/৪২১৪ ছহীহ বলেছেন)।
৫-রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী:
(مَنْ غَدَا إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيْدُ إِلَّا لِيَتَعَلَّمَ خَيْراً أَوْيُعَلِّمَهُ كَانَ لَهُ كَأَجْرِ مُعْتَمِرٍ تّامِّ الْعُمْرَةِ، فَمَنْ رَاحَ إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيْدُ إِلَّا لِيَتَعَلَّمَ خَيْراً أَوْ يُعَلِّمَهُ فَلَهُ أَجْرِ حَاجٍّ تَامِّ الحْـَجَّةِ)[أخرجه الحاكم، كتاب العلم رقمه ৩১১، وصححه على شرط البخاري ووافقه الذهبي. ورواه الطبراني بلفظ: من غدا إلى المسجد لا يريد إلا أن يتعلم خيراً أو يعلمه كان له كأجر حاج تاماً حجته. وهو في صحيح الترغيب رقم ৮৬، وقال حسن صحيح].
যে ব্যক্তি সকালে মসজিদের দিকে রওয়ানা হবে কোন কল্যাণ শিক্ষা করার জন্য বা শিক্ষা দেওয়ার জন্য, তাহলে সে একজন পূর্ণাঙ্গ উমরাহ্কারীর মত নেকী অর্জন করবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধাকালীন মসজিদ অভিমুখে বের হবে শুধু মাত্র কল্যাণ শিক্ষা করার জন্য বা শিক্ষা দেওয়ার জন্য সে পূর্ণাঙ্গ হজকারীর ন্যায় নেকী পাবে। (হাকেম,ইলম অধ্যায়,হা/৩১১,হাকেম এটিকে বুখারীর শর্তানুযায়ী ছহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তাঁর সমর্থন করেছেন। তাবারানী হাদীছটি এই শব্দে বর্ণনা করেছেন: ‘যে ব্যক্তি সকালে একমাত্র কল্যাণ শিক্ষা করা বা কল্যাণ শিক্ষা দেওয়ার জন্য মসজিদ অভিমুখে বের হবে সে একজন পূর্ণাঙ্গ হজকারীর ন্যায় নেকী পাবে।’ হাদীছটি ছহীহ তারগীবে ৮৬ নম্বরে বিধৃত হয়েছে। সংকলক বলেন: হাদীছটি হাসান ও ছহীহ)।
ইলমের ফযীলত সম্পর্কে সালাফে ছালেহীনের কিছু উক্তি :
মু’আয বিন জাবাল (রাঃ) বলেনঃ এই ইলম দ্বারাই আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা হয়, হারাম থেকে হালাল চেনা যায়। ইলম হল ইমাম স্বরূপ এবং তার উপর আমল করা হল তার মুক্তাদী বা অনুসারী। এটি সৌভাগ্যশীলদেরকে ইলহাম করা হয় এবং হতভাগ্যদেরকে ইহা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রহ. বলেনঃ মানুষ পানাহারের চেয়েও এই ইলমের দিকে বেশী মুখাপেক্ষী। কারণ এক ব্যক্তি দৈনিক এক বার বা দুই বার পানাহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। অথচ তার ইলমের প্রয়োজন হয়ে থাকে তার শাস-নিঃশ্বাসের সংখ্যা পরিমাণ।
ইবনু আবী হাতেম রহ. বলেনঃ আমি মুযানীকে বলতে শুনেছি তিনি শাফেঈকে লক্ষ্য করে বলেছেন: আপনার ইলমের প্রতি চাহিদা কিরূপ? তিনি বললেন: নতুন কোন কোন অক্ষর বা বাক্য শুনলে আমার সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গ এই আশা করে যে তাদের যদি শ্রবণ শক্তি হত তাহলে তারাও আনন্দবোধ করত যেভাবে দুই কান আনন্দ উপভোগ করে থাকে। তাঁকে বলা হলঃ ইলমের প্রতি আপনার আকর্ষণ কেমন? তিনি বললেনঃ যেমন ভাবে একজন ধন সঞ্চয়কারী কৃপণ ব্যক্তি ধন সংগ্রহে লালায়িত থাকে ঠিক তদ্রূপ আমি ইলমের ক্ষেত্রে লালায়িত। তাঁকে প্রশ্ন করা হল: আপনি এই ইলম কিভাবে অর্জন করেন? তিনি বললেন: যেরূপ কোন মহিলা তার একমাত্র সন্তানটিকে হারিয়ে তালাশ করতে থাকে সেরূপ আমি ইলম অন্বেষণ করি।

 

আসসালামু আলাইকুম ইসলামিক দলিল ভিত্তিক পোস্ট পেতে আমাদের এই মিডিয়ার সাথে থাকবেন সব সময়। এতে করে সঠিক টা জানতে পারবেন ও সঠিক আমল করতে পারবেন।আমাদের পেজ লিংক দেয়া আছে ওয়েবসাইট এ সেখানে চাইলে যেকোন প্রশ্ন করতে পারবেন। ইনশাআল্লাহ আমাদের এডমিন পেনেল আপনার উত্তর দলিল সহকারে দেয়ার চেস্টা করবেন। জাজাকাল্লাহু খাইরান

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Skip to toolbar