কোরআন পড়ার ও মুখস্ত করার ফযীলাত

Spread the love

কোরআন পড়ার ও মুখস্ত করার ফযীলাত

পোষ্টটি অনেক বড়, ধৈর্য্য ও মনোযোগ সহকারে পড়লে আপনারা লাভবান হবেন বলে আশা করছি।
সম্মানিত কোরআনের : মর্যাদা, শিক্ষা ও বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা —
মানব অন্তর ময়লাযুক্ত হয়ে কঠিন হয়ে যায়। দুনিয়ার প্রাচুর্যের মোহ ও প্রবৃত্তি (কামনা বাসনা খেয়াল খুশী) এর চাহিদা আত্মাকে দুর্বল ও অসুস্থ করে ফেলে। মানুষকে এ পৃথিবীতে আত্মা, প্রবৃত্তি, ও শয়তানের সাথে যুদ্ধ ও সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। একজন যোদ্ধাকে যদি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় প্রকার অস্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হয় তাহলে চিরন্তন সফলতা যে যুদ্ধে বিজয় লাভের উপর নির্ভরশীল এমন যুদ্ধের যোদ্ধাকে অবশ্যই সক্রিয় ও কার্যকর অস্ত্রে সজ্জিত হতে হবে। আর তা হচ্ছে নিজ আত্মাকে সংশোধন ও পবিত্রকরণ। এ ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহ ভিন্ন অন্য কোন পথ ও পদ্ধতি নেই। কোরআন সম্পর্কে বলতে গেলে রমজান প্রসঙ্গে দুটি কথা বলতে হয় কয়েক কারণে। যেমন :—
১. রমজান মাসেই কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কোরআন অবতরণের সূচনা রমজান মাসেই হয়েছে, তখন সূরা আলাকের প্রথম কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হয়।
৩. ফেরেশতা জিবরাইল আ. রমজানের প্রতি রাতে এসে রাসূলুল্লাহ সা.-কে কোরআন শিখাতেন আর তিনিও তাকে পূর্ণ কোরআন শুনিয়ে দিতেন। এ ব্যাপারটি রমজান মাসে কোরআন সম্পূর্ণ পড়ে শেষ করার বৈধতাকে প্রমাণ করে। তাছাড়া কোরআন সম্পূর্ণ পড়ে শেষ করা সারা বছরেই গুরুত্বপূর্ণ উত্তম কাজ। তবে, রমজানে এর গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়।
প্রথমত : কোরআনের মর্যাদা, গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য।
কোরআনুল কারীমের মর্যাদা, গুরুত্ব, অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনেই অনেক আয়াত বর্ণিত হয়েছে, যেমনি এ প্রসঙ্গে বহু হাদিস রয়েছে। কতক এখানে তুলে ধরা হল।
(১) কোরআন বিশ্ব প্রতিপালক পবিত্র ও মহান আল্লাহর কথা। তিনি তা স্বীয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর রূহুল আমীন জিবরাইল আ.-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :-
মুশরিকদের কেউ যদি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, আপনি তাকে আশ্রয় দিয়ে দিন, যাতে সে আল্লাহর কথা শুনতে পায়।[সূরা আত তাওবা ৬]
(২) কোরআন মানবতার জন্য দিক-নির্দেশনা ও আলোকবর্তিকা। তাদেরকে প্রতিটি ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট পথ-পানে পথ-নির্দেশ করে। আল্লাহ বলেন-
নিশ্চয় এ কোরআন এমন পথ-প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।[ সূরা আল ইস্রা ৯]
কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতি যত সমস্যার সম্মুখীন হবে, তাদের যা যা প্রয়োজন হবে সকল বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে এ কোরআনে, আল্লাহ বলেন –
এবং আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি যা প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা। সঠিক পথ, দয়া এবং মুসলমানদের জন্য সুসংবাদ। (সূরা নাহল : ৮৯)
৩. মহান আল্লাহ তাআলা এর নাম দিয়েছেন ফোরকান, (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী) যা হালাল-হারাম, সঠিক ও ভুল পথের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে।
৪. কোরআনুল কারীম আমাদের পূর্ববর্তীদের ঘটনাবলী, পরবর্তীদের সংবাদ, ভালো মুসলিমদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ এবং কফের (সত্য অস্বীকারকারী) দের জন্য জাহান্নামের দু:সংবাদের বর্ণনায় পরিপূর্ণ। বর্ণিত সকল বিষয়ের বর্ণনায় এটি ততোধিক সত্য বক্তব্য প্রদানকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন –
আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম।[ সূরা আল আনাম ১১৫]
৫. আল কোরআন বিশ্ববাসী সকলের জন্য দয়া। সে গাফেল (অমনোযোগী) হৃদয়কে জাগ্রত ও সক্রিয় করে, অন্তরকে শিরক-মুনাফিকি এবং শরীরকে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি থেকে সুস্থ করে তোলে। যেমন এ কথা সূরা ফাতেহা ও সূরা নাস, ফালাক ইত্যাদির ক্ষেত্রে সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
হে মানুষ! তোমাদের কাছে উপদেশ বাণী এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, সঠিক ও দয়া ভালো মুসলিমদের জন্য। [ সূরা ইউনুস ৫৭]
তাই দেখা যায় কোরআন অধ্যয়নের মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত হয়। দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন –
যারা ঈমান আনে, বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে। জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ (কুরআন) দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়। [সূরা আর রাদ ২৮]
কোরআনুল কারীম খুবই বরকতময়। তার উপকারিতা সু-বিশাল, মানবকুল কোরআনের মাধ্যমে দুনিয়া আখেরাত-উভয় জগতের কল্যাণ ও উন্নতি লাভ করতে পারে, বলা হচ্ছে :—
এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সঠিক পথ আসে, তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্ট ভোগ করবে না। এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবন হবে কষ্টের এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ করে উত্থিত করব। সে বলবে, হে আমার পালন-কর্তা ! আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমিতো চোখওয়ালা ছিলাম। আল্লাহ বললেন-এমনিভাবে তোমার কাছ আমার আয়াত সমূহ এসেছিল। অত:পর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনি করে আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। (সূরা ত্বহা: ১২৩-১২৬)
৭. আলকোরআনুল এমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কিতাব যা আল্লাহ তাআলার সংরক্ষণে সংরক্ষিত। আল্লাহ বলেন :—
নিশ্চয় আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তা সংরক্ষণ করব। [সূরা আল হিজর ৯]
৮. কোরআনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল, যে ব্যক্তি এটি বুঝার ও অনুধাবন করার চেষ্টা করে, সে তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে, হৃদয়ে নাড়া দেয়। অন্তরকে মার্জিত ও পরিশীলিত করে। আত্মাকে করে সংশোধিত। মানুষকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহী করে তোলে। তার প্রভাব ও আছর শুধু মানুষ জাতি পর্যন্তই সীমিত নয় ; বরং একে যদি খুব মজবুত ও শক্ত পাহাড়ে অবতীর্ণ করানো হত তাহলে অবশ্যই সেটি কেঁপে উঠত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন :—
যদি আমি এ কোরআন পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম তবে আপনি দেখতে পেতেন যে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তাআলার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে, আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। (সূরা হাশর : ২১)
৯. এ কোরআন মুসলিম জাতির জন্য উপদেশ ও সম্মানের বস্তু। বলা হচ্ছে :—
কোরআন তো আপনার ও আপনার জাতির জন্য সম্মানের বস্তু। অবশ্যই এ বিষয়ে সত্ত্বর জিজ্ঞাসিত হবেন। (সূরা যুখরুফ : ৪৪)
১০. সালাতের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোরআনের সূরা ফাতেহা পড়া ব্যতীত বিশুদ্ধ হয় না। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :—
যে ব্যক্তি সূরা ফাতেহা পড়ে না তার সালাতই হয় না। (বোখারি ও মুসলিম)
(১১) যারা সঠিক পথ পাওয়ার আশা করে এবং এর জন্য চেষ্টা করে, মহান আল্লাহ তাআলা তাদের উদ্দেশ্যে কোরআন পড়া, বুঝা, মুখস্ত করা, এর বিষয় বস্তু গভীরভাবে চিন্তা করে বোঝা ও তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা খুব সহজ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
এবং আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝা ও উপদেশ গ্রহণের জন্য। কোন চিন্তাশীল উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি? (সূরা কমর : ১৭)
সুতরাং, কোরআন আল্লাহ তাআলার একটি বিশাল নেয়ামত ও বিশেষ অনুগ্রহ। তাই আমাদের সকলের এ কোরআন পেয়ে আনন্দিত হওয়া এবং সদা আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তাদের আনন্দিত ও সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। তারা যা সঞ্চয় করছে তা অপেক্ষা এটিই অতি উত্তম। (সূরা ইউনুস : ৫৮)
দ্বিতীয়ত : কোরআনুল কারীমের মূল্যায়ন ও গুরুত্ব প্রদান :—
পৃথিবীতে অনেক মুসলমান আছেন, যারা তার পক্ষে যতটুকু সহজ ততটুকু শুধুমাত্র পড়াকেই কোরআনের যথাযথ অধিকার আদায় ও মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট মনে করেন। তাদের সম্পর্কে ইমাম হাসান বসরী রহ. চমৎকার বলেছেন –
কুরআন-তদনুযায়ী-কাজ করার জন্য অবতীর্ণ হল আর লোকেরা শুধু পড়াকেই কজ বানিয়ে বসে আছে।
সুতরাং, শুধু পড়া -ই কোরআনের অধিকার আদায়ের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং যথাযথ মূল্যায়নের জন্য পড়ার পাশাপাশি একে বুঝতে হবে-বুঝার চেষ্টা করতে হবে, মুখস্ত করতে হবে, বর্ণিত বিষয়াদিতে চিন্তা গবেষণা করতে হবে, তদনুযায়ী কাজ করতে হবে, শাসন, বিচার ও বিরোধ-মীমাংসার জন্য তার শরণাপন্ন হতে হবে। কিন্তু, দু:খজনক ব্যাপার হল লোকেরা শুধু এর পড়াকেই যথাযথ মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট মনে করছে। এর চেয়েও দু:খজনক হচ্ছে-যারা পড়াকে যথেষ্ট মনে করছে তাদের অধিকাংশ এ পড়ার ব্যাপারে অবহেলা-উপেক্ষা করছে :—
বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে যায় অথচ পূর্ণ বৎসরে একবারও সম্পূর্ণ কোরআন পড়ে শেষ করতে পারে না। একটিমাত্র সূরাও মুখস্থ করে না। রমজান মাস, যখন সকল মুসলমান পূর্ণোদ্দমে কোরআন অধ্যয়নসহ সকল ইসলামি কর্মকাণ্ড সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে সম্পাদন করে, তখনও কিছু মুসলমানকে আপনি দেখতে পাবেন, যারা এর পড়া থেকে দূরে, এ বরকতময় মাসেও এর সম্পূর্ণ পড়ে শেষ করার জন্য চেষ্টা করে না।
কোরআনুল কারীমের মূল্যায়নের দিক সমূহ :—
১. পড়া—
পড়ার গুরুত্ব :—
(১) কোরআনুল কারীমের যথাযথ পড়া ও অধ্যয়ন আল্লাহর সাথে একটি লাভজনক ব্যবসা। আল্লাহ তাআলা বলেন –
যারা আল্লাহর কিতাব (কুরআন) পড়ে, সালাত বা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা করে, যাতে কখনও লোকসান হবে না। পরিণামে তাদেরকে আল্লাহ তাদের সওয়াব পুরোপুরি দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশি দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল মূল্যায়নকারী। (সুরা-ফাতির-২৯-৩০)
(২) যে কোরআন পড়ে সে প্রত্যেক অক্ষরের পরিবর্তে একটি করে নেকি লাভ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন –
যে ব্যক্তি কোরআন থেকে একটি অক্ষর পড়বে তাকে একটি নেকি দেয়া হবে। উক্ত এক নেকি হবে দশ নেকির সমতুল্য। আমি একথা বলি না যে আলিফলামমীম একটি অক্ষর বরং আলিফ একটি অক্ষর লাম একটি অক্ষর মীম একটি অক্ষর। (আলিফলামমীম পড়বে করলে ন্যূনতম ত্রিশটি নেকি পাবে) (তিরমিজি)।
(৩) কোরআন পাঠকারী ভিতর বাহির উভয় দিক থেকে উত্তম-উৎকৃষ্ট। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন –
যে ভালো মুসলিম কোরআন পড়ে সে কমলা লেবুর মতো যার সুগন্ধি বড় চমৎকার এবং স্বাদও সুমিষ্ট। আর যে ভালো মুসলিম কোরআন পড়ে না সে খেজুরের মতো। যার গন্ধ নেই, কিন্তু স্বাদ বড় মিষ্ট। আর যে মুনাফেক কোরআন পাঠ করে সে মাকাল ফলের মত যার সুগন্ধি চমৎকার কিন্তু স্বাদ বড়ই তিক্ত। আর যে মুনাফেক কোরআন পড়ে না সে হানযালা বা কেদাঁ ফলের সমতুল্য যার কোন ঘ্রাণ নেই এবং স্বাদও তিক্ত। (বোখারি মুসলিম)
৪. কোরআন পাঠে প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়।
সাহাবি বারা ইবনে আযেব রা. বর্ণনা করেছেন-জনৈক সাহাবি সূরা কাহাফ পড়ছিলেন। তার নিকট রশি দিয়ে বাঁধা একটি ঘোড়া ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই একটি মেঘ তাকে ঢেকে নিল এবং ক্রমেই সেটি কাছে আসছিল আর ঘোড়া ছোটাছুটি করছিল। সকাল হলে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে পূর্ণ ঘটনা খুলে বললেন। শুনে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন সেটি সাকীনা (এক প্রকার বিশেষ রহমত যা দ্বারা অন্তরের প্রশান্তি লাভ হয়) কোরআনুল কারীম পড়ার কারণে অবতীর্ণ হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)
(৫) কোরআনের একটি আয়াত (পাঠ করা বা শিক্ষা দেয়া) উটের মালিক হওয়া অপেক্ষা উত্তম।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :-তোমাদের কেউ কেন সকালে মসজিদে গিয়ে আল্লাহর কোরআন হতে দুটি আয়াত পড়ে না বা শিক্ষা দেয় না ? তাহলে সেটি তার জন্য দুটি উট লাভ করার চেয়ে উত্তম হবে। তিনটি আয়াত তিনটি উট অপেক্ষা উত্তম। চারটি আয়ত চার উট অপেক্ষা উত্তম। অনুরূপ আয়াতের সংখ্যা অনুপাতে উটের সংখ্যা অপেক্ষা উত্তম। (মুসলিম)
৬. কোরআনুল কারীম নিয়মিত পাঠকারী ও তদনুযায়ী আমলকারীর পক্ষে কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-তোমরা কোরআন পড়ো, কেননা, কোরআন কিয়ামতের দিবসে পাঠকারী ও আমলকারীর জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। (মুসলিম)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :—
কেয়ামতের দিন কোরআন এবং পৃথিবীতে কোরআনের মর্মানুযায়ী আমলকারীদেরকে এমতাবস্থায় উপস্থিত করা হবে সূরা বাকারাহ ও সূরা আলে ইমরান আগে আগে চলবে এবং এদের পাঠকারী ও আমলকারীদের জন্য সুপারিশ করতে থাকবে। (মুসলিম)
৭. কোরআনের পাঠক ও আমলকারী দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করবে-
যে কোরআন শিখে ও শিক্ষা দেয় সে তোমাদের শ্রেষ্ঠতর। (বোখারী)
কোরআন পড়ার প্রতি সাহাবাদের আগ্রহ ছিল ঈর্ষণীয়। পড়ার মর্যাদা জানার পর তাদের কেউ কেউ সব সময়ের জন্য সারারাত না ঘুমিয়ে কোরআন পড়ায় কাটিয়ে দেয়ার সংকল্প করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত সংকল্প সম্পর্কে জেনে এরূপ না করার পরামর্শ দিয়ে বললেন বরং প্রতি সাত দিনে একবার করে সম্পূর্ণ কোরআন পড়ে শেষ করতে পার। তাইতো দেখা যায়, তাদের অধিকাংশই প্রতি সাত দিনে একবার করে সম্পূর্ণ কোরআন পড়ে শেষ করতেন।
কোরআন পড়ার প্রতি তাদের এরূপ যত্নশীল হওয়া সত্ত্বেও যদি কখনো কেউ অন্য কাজে ব্যস্ততার কারণে বা ঘুমের কারণে রাতে পড়তে না পারতেন তাহলে পরদিন সে অংশটুকু অবশ্যই পড়ে নিতেন।
যে ব্যক্তি স্বীয় নির্ধারিত অংশ বা তার অংশ বিশেষ রাতে না পড়েই ঘুমিয়ে যায় অত:পর পরদিন ফজর ও জোহরের মধ্যবর্তী সময়ে পড়ে নেয়। তাহলে রাতে পড়া হয়েছে ধরেই আল্লাহর নিকট নির্বাচিত হবে। [মুসলিম]
আবার তাদের কেউ কেউ প্রতি দিনে একবার করে সম্পূর্ণ কোরআন পড়ে শেষ করতেন। রমজান মাস আসলে কোরআন পড়ার প্রতি তাদের চেষ্টা ও পরিশ্রম আরো বেড়ে যেত। রমজানে সালাতের মধ্যে এবং অন্য সময় পড়ার জন্য তারা কঠোর পরিশ্রম করতেন।
ইমাম বোখারি রহ. বলতেন :—
যখন রমজান আসবে তখন সেটি হবে একমাত্র কোরআন পড়া ও অপরকে খাওয়ানোর মাস।
ইমাম মালেক রহ. রমজান আসলে হাদিসের অধ্যয়ন, ইসলামি জ্ঞান শিক্ষার আসরসহ যাবতীয় কাজ ছেড়ে দিয়ে (রাতদিন শুধু) মাসহাফ থেকে কোরআন পড়ার প্রতি বেশি মনোযোগী হতেন। এর অর্থ এই নয় যে, শুধু চিন্তা ও গবেষণার দিক ও পড়ার অধিকার প্রদানকে জলাঞ্জলি দিয়ে শুধু পড়ার প্রতিই গুরুত্ব দেয়া হবে। বরং অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায় বা অক্ষর অস্পষ্ট থাকে এমন করে খুব দ্রুত বেগে পড়ার অনুমতি নেই। আল্লাহর বাণী কোরআন পড়ার অনেক আদব আছে পড়ার সময় সে গুলোর প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা খুবই জরুরি।
কুরআন পড়ার আদব ও আহকাম :
১. আন্তরিকতা-সুতরাং লোকের প্রশংসা ও বাহবা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে কুরআন পড়া যাবে না। এবং একে জীবিকা নির্বাহের উপলক্ষণও বানানো যাবে না। বরং কুরআন পড়ার সময় এ অনুভূতি ও আগ্রহ নিয়ে কুরআন পড়তে হবে যে, মহান আল্লাহ তাআলা তার মহান কুরআনের মাধ্যমে তাকে সম্বোধন করছেন। একাগ্রতা ও চিন্তা গবেষণা বাদ দিয়ে শুধু সময় কাটানো এবং সুন্দর কণ্ঠের ক্বারীদের মিষ্টি আওয়াজ উপভোগ করার উদ্দেশ্যে কুরআন পড়া ও শোনা-কোনটিই জায়েজ নেই।
নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
তোমরা কোরআন পড় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা কর ; কারণ ভবিষ্যতে এমন এক জাতির আবির্ভাব ঘটবে যারা কোরআনের দ্বারা দুনিয়ার সুখ অন্বেষণ করবে। পরকালের সুখ কামনা করবে না। [মুসনাদে ইমাম আহমদ]
২. মিসওয়াক করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-মিসওয়াকের মাধ্যমে তোমার স্বীয় মুখ সুগন্ধি যুক্ত কর ; কেননা এটি কোরআনের রাস্তা।
৩. পবিত্রতা অর্জন করা : এটি আল্লাহ তাআলার কুরআনের মর্যাদা প্রদান ও সম্মান প্রদর্শন। অপবিত্রাবস্থায় গোসল না করে কুরআন পড়া যাবে না। পানি না থাকলে বা অসুস্থতা ও এ জাতীয় কোন কারণে ব্যবহারে অক্ষম হলে তায়াম্মুম করবে। অপবিত্র ব্যক্তির পক্ষে আল্লাহর ইবাদত এবং কোরআনের সাথে সামঞ্জস্যশীল বাক্যাবলীর মাধ্যমে দোআ করা জায়েজ। তবে ঐ বাক্যের মাধ্যমে কুরআন পড়া উদ্দেশ্য হওয়া যাবে না, উদ্দেশ্য হবে শুধু দোআ। যেমন-বলল : লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিজ্জলেমিন (হে আল্লাহ, তুমি ছাড়া কোনো মাবূদ নেই আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি আমি তো অপরাধীদের একজন)।
৪. কুরআন পড়ার জন্য অন্যায় অশ্লীল ও অনর্থক কথা-বার্তা এবং হৈ চৈ মুক্ত-পাশাপাশি কোরআনের ভাব মর্যাদার সাথে সংগতিপূর্ণ স্থান নির্বাচন করা। সুতরাং অপরিচ্ছন্ন নোংরা পরিবেশে এবং কোরআন শোনার প্রতি অমনোযোগী সমাবেশে কুরআন পড়বে না। কারণ এতে কোরআনের অমর্যাদা হয়। অনুরূপভাবে শৌচাগার ইত্যাদিতেও কোরআন পড়া জায়েজ নেই। কুরআন পড়ার জন্য সর্বোত্তম স্থান হচ্ছে আল্লাহর ঘর মসজিদসমূহ-এতে একই সাথে কুরআন পড়া এবং মসজিদ অবস্থান উভয় সওয়াব পাওয়া যাবে। সাথে সাথে ফেরেশতাদের ইস্তিগফারে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে-যখন নামাজের অপেক্ষায় থাকবে অথবা নামাজ আদায় করার পর বসবে।
কুরআন পড়া ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে যারা মসজিদে বসে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ বলেন :—
আল্লাহ যে সব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করেছেন এবং সে গুলোতে তার নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন এবং সেখানে সকাল সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এমন লোকেরা যাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য ও ক্রয় বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে নামাজ কায়েম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সে দিনকে যে দিন অন্তর ও দৃষ্টি সমূহ উলটে যাবে। (তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে) যাতে আল্লাহ তাদের উৎকৃষ্টতর কাজের প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসাব জীবিকা দান করেন। (সূরা নূর-৩৬-৩৮)
৫. খুব আদবের সাথে বিনম্র ও শ্রদ্ধাবনত হয়ে বসা। শিক্ষক সামনে থাকলে যেভাবে বসত ঠিক সেভাবে বসা। তবে দাঁড়িয়ে শুয়ে এবং বিছানাতেও পড়া জায়েজ আছে।
৬. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার্থে আউযুবিল্লাহ …বলা এবং এটি খুবই জরুরী। আল্লাহ তাআলা বলেন :—
অর্থাৎ যখন তুমি কোরআন পড়ার ইচ্ছা করবে তখন বল- আমি বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর নিকটে বাচতে চাই।
(৭) সূরা তাওবা ব্যতীত অন্য সকল সূরার শুরুতে – বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম (পরম রুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি) পড়া।
যদি সূরার মাঝখান থেকে পড়া হয় তাহলে বিসমিল্লাহ… পড়ার প্রয়োজন নেই।
(৮) উপস্থিত ও সচেতন মন দিয়ে কোরআন পড়া। চিন্তা করবে কি পড়ছে। অর্থ বুঝার চেষ্টা করবে। মন বিনম্র হবে এবং ধ্যান করবে যে মহান আল্লাহ তাকে সম্বোধন করছেন। কেননা, কোরআন আল্লাহরই কথা।
(৯) কোরআন পড়ার সময় কান্নাকাটি করা। এটি নেককার ভালো মানুষদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ বলেন-
যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তাদের সামনে যখন এটা পাঠ করা হয় তখন তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। আর তারা বলে, ‘আমাদের রব্ব মহান, পবিত্র; আমাদের রব্বের ও‘য়াদা অবশ্যই পূর্ণ হবে। তারা সেজদায় পড়ে কাঁদতে থাকে এবং এটা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে। (সূরা ইসরা ১০৭-১০৯)
এবং যখন ইবনে মাসঊদ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোরআন শোনাচ্ছিলেন, এবং পড়তে পড়তে –
তখন কি অবস্থা হবে যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী রূপে উপস্থিত করব। (সূরা নিসা:৪১)
-আয়াত পর্যন্ত পৌঁছোলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (ব্যাস, যথেষ্ট) আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখি তার দু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। (বোখারি)
১০. তারতীল তথা ধীরে-ধীরে স্পষ্ট ও সুন্দর করে পড়া। এভাবে পড়া উত্তম। কেননা আল্লাহ বলেন,
কোরআন আবৃতি কর ধীরে ধীরে। স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে। এভাবে পড়লে বুঝতে ও চিন্তা করতে সহজ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এমনই পড়তেন। উম্মুল মোমিনীন সালমা রা.-ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোরআন পড়া প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এমনটিই বলেছেন যে প্রত্যেক শব্দ পৃথক পৃথক ও সুস্পষ্ট ছিল। আবু দাউদ-মুসনাদের রেওয়াতে এসেছে :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক আয়াতের শেষে থামতেন। সাহাবি ইবনে মাসঊদ রা. বলেন :—
তোমরা কোরআনকে গদ্য আবৃত্তির ন্যায় বিক্ষিপ্তাকারে আবার কবিতার ন্যায় পঙ্ক্তি মিলিয়ে তিলাওয়াত করবে না (বরং কোরআনের স্বতন্ত্র ধারা বজায় রেখে পড়বে) বিস্ময়কর বর্ণনা আসলে থামবে এবং হৃদয় নাড়া দেয়ার চেষ্টা করবে। সূরা শেষ করাই যেন তোমাদের কারো সংকল্প না হয়।
তারতীলের সাথে ধীরে ধীরে স্পষ্টকরে পঠিত অল্প কোরআন পড়া অনেক উত্তম, দ্রুততার সাথে পঠিত বেশি কোরআন পড়ার থেকে।
কারণ কোরআন পড়ার উদ্দেশ্য তো বুঝা ও চিন্তা করা এবং এটিই ঈমান বৃদ্ধি করে। তবে হ্যাঁ, দ্রুততার সাথে পড়তে গিয়ে যদি শব্দের উচ্চারণ ঠিক থাকে তাড়া হুড়ার কারণে কোন রূপ বিভ্রাট-বিভ্রান্তি ও অক্ষরবিয়োগ বা অতিরিক্ত কিছুর সংযোগ-ইত্যাদি সমস্যা না হয় তাহলে অসুবিধা নেই। এরূপ কিছু সৃষ্টি হলে বা উচ্চারণ বিভ্রাট দেখা দিলে হারাম হবে। তারতীলের সাথে পড়ার পাশাপাশি, কোরআন পড়ায় দয়ার আয়াত আসলে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ প্রার্থনা করা, আজাবের আয়াত আসলে তার নিকট আজাব ও বিপদ থেকে আশ্রয় চাওয়া এবং এগুলো থেকে নিরাপদ থাকার দোয়া করা, তার পবিত্রতার বর্ণনা সম্পর্কিত আয়াত আসলে সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র) জাতীয় বাক্য বলে তার পবিত্রতার স্বীকৃতি দেয়া ভালো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে সালাত আদায়কালে এমনটিই করতেন। মুসলিম।
(১১) কোরআন পড়ার একটি আদব হলো-উচ্চস্বরে পড়া। এটি ভালো ও বটে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:—
আল্লাহ তাআলা নবীজীর উচ্চকণ্ঠে সুরেলা আওয়াজে কোরআন পড়াকে যে রূপ গুরুত্ব সহকারে শ্রবণ করেন এরূপ গুরুত্ব দিয়ে অন্য কিছু শুনেন না। বোখারি ও মুসলিম।
এর দ্বারা কবুল ও পছন্দ করার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা নবীজীর সুরেলা ও উচ্চকণ্ঠের পড়াকে অন্য সকল কাজের চেয়ে অধিক পছন্দ করেন এবং কবুল করেন। কিন্তু কোরআন পড়ার কাছাকাছি যদি কেউ থাকে এবং আওয়াজের কারণে তার কষ্ট-বিরক্তি বোধ করে-যেমন ঘুমন্ত ও সালাতরত ব্যক্তি-তাহলে আওয়াজ বড় করে তাদেরকে বিরক্ত করা যাবে না। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের নিকট এসে দেখলেন তারা উচ্চ আওয়াজে কিরাআত সহ সালাত আদায় করছে। তখন তিনি বললেন :
তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় প্রতি পালকের সাথে একান্ত কথা বলছ। অতএব কোরআন পড়ার ক্ষেত্রে একে অন্যের উপর আওয়াজ বড় কর না। বর্ণনায় ইমাম মালেক রহ.।
(১২) সুন্দর আওয়াজ ও সুরেলা কণ্ঠে কোরআন পড়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
তোমরা স্বীয় আওয়াজের মাধ্যমে কোরআনকে সুন্দর কর। আবু দাউদ।
তিনি আরো বলেন :—
যে ব্যক্তি সুরেলা কণ্ঠে কোরআন পড়ে না (করাকে পসন্দ করে না) সে আমাদের দলভুক্ত নয়। বোখারি শরীফ। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের টানাটানি ও স্বর দীর্ঘ করার চেষ্টা করবে না।
(১৩) পড়ার সময় কোরআনের আদব ও ইহতেরামের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অহেতুক কাজ থেকে এবং চোখ, কান, এদিক সেদিক তাকানো থেকে বিরত রাখতে হবে।
(১৪) ধারাবাহিক ও বিরতিহীন কোরআন পড়ে যাওয়া। প্রয়োজন ব্যতীত মাঝখানে বিরতি না দেয়া। তবে হ্যাঁ সালামের উত্তর, হাঁচির জবাব, এবং এ জাতীয় প্রয়োজনে থামার অনুমতি আছে বরং এগুলো খুবই ভালো, যাতে সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হয়। অত:পর আউযু বিল্লাহ পড়ে নতুন করে পড়া শুরু করবে।
(১৫) সেজদার আয়াত পড়লে সেজদা করা। আল্লাহ আকবার বলে সেজদায় সুবহা-না রব্বিয়াল আ‘লা (আমার রব্বের পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করছি, যিনি সবার উপরে) এবং অন্যান্য দোয়াও পড়বে। সেজদার আয়াতে সালাম নেই। যদি নামাজরত অবস্থায় সেজদার আয়াত তিলাওয়াত করা হয় তাহলে নামাজেই সেজদা দিতে হবে। আল্লাহু আকবার বলে সেজদায় যাবে এবং আল্লাহু আকবার বলে উঠবে।
(১৬) সম্পূর্ণ কোরআন পড়ে শেষ করার পর দোয়া করা। যিনি সম্পূর্ণ কোরআন পড়ে শেষ করবেন তার পক্ষে দোয়া করা ভালো। সাহাবি আনাস বিন মালেক রা. সম্পর্কে প্রমাণিত যে তিনি সম্পূর্ণ কোরআন পড়ে শেষ করলে পরিবারস্থ সকলকে একত্রিত করে তাদের নিয়ে দোয়া করতেন। দারেমী।
(২) সম্মানিত কুরআন মুখস্ত করা :—
সম্মানিত কুরআন মুখস্ত করা, কোরআনের গুরুত্ব প্রদান এবং তদানুযায়ী কাজের আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহের দলিল বহন করে। তাছাড়া একজন মুসলমানকে দৈনন্দিন জীবনে যে কাজগুলো করতে হয় সেগুলো সুন্দর ও সার্থক ভাবে সম্পূর্ণ করতে হলে কুরআন মুখস্ত ছাড়া উপায় নেই। কারণ তাকে সালাতে ইমামতি করতে হয়। সেখানে কোরআনের প্রয়োজন। ধর্মীয় আলোচনা করতে হয়। বক্তৃতা দিতে হয় সেখানে কোরআন থেকে দলিল উপস্থাপনার প্রয়োজন পড়ে। বাচ্চাদের মুখস্ত করাতে হয়-এতসব কাজ করতে গেলে কোরআন মুখস্ত না করে কি ভাবে সম্ভব ?
তাছাড়া পৃথিবীতে হাফেযে কোরআনরাই কোরআনে কারীমের তিলাওয়াত সবচে বেশি করেন। তারা যখন মুখস্ত করে তখন একটা আয়াত কতবার করে পড়তে হয় ? মুখস্ত শেষ করে মনে রাখার জন্য সারা জীবন খুব করে কুরআন পড়তে হয়। এছাড়া একজন হাফেযে কোরআন কোরআন মুখস্থ থাকার কারণে যখন ইচ্ছা যেখানে ইচ্ছা…কুরআন পড়তে পারেন। যেমন সালাত, চলার পথে, গাড়িতে থাকা অবস্থায়, কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইত্যাদি। এ সুযোগ তো হাফেয ব্যতীত অন্যরা পায় না। এত সব কারণে কোরআন মুখস্থ করার গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক গুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
(১) কোরআন ভালভাবে মুখস্থকারী পূত-পবিত্র। সম্মানিত ফেরেশতাদের শ্রেণিভুক্ত। রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন :—
কোরআন মুখস্থকারী (হাফেয) যিনি সব সময় পড়েন তার তুলনা লেখার কাজে নিয়োজিত পূত পবিত্র, সম্মানিত ফেরেশতাদের সাথে, আর যিনি কষ্ট স্বীকার করেও নিয়মিত পড়েন, তার সওয়াব দ্বিগুণ। বোখারি।
(২) হাফেযে কোরআন সালাতে ইমামতির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। রাসূল সা. বলেন –
আল্লাহর কিতাব সর্বাধিক পাঠকারী অভিজ্ঞরাই লোকদের ইমামতি করবে। (মুসলিম শরীফ)
(৩) হাফেযে কোরআন মুখস্থ করার মাধ্যমে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা আরোহণ করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন –
কোরআন পাঠকারীকে বলা হবে, পড়তে থাক এবং মর্যাদার আসনে উন্নীত হতে থাক এবং তারতীলের সাথে সুন্দর করে পড়। যেরূপ পৃথিবীতে পড়তে। নিশ্চয় তোমার মর্যাদার আসন হবে তোমার পঠিত আয়াতের শেষ প্রান্তে। আহমদ, তিরমিজি।
এ হাদিসে পাঠকারী বলতে হাফেযকে বুঝানো হয়েছে। এ দাবির সমর্থনে দুটি যুক্তি পেশ করা যায়। (ক) তাকে বলা হবে- তুমি পড়। অথচ সেখানে কোনো বই থাকবে না। (যে দেখে দেখে পড়বে)
(খ) এখানে একটি তুলনা মূলক বিশেষ সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি বই থেকে দেখে দেখে পাঠ করাকেও শামিল করা হয় তাহলে এখানে তার বিশেষত্ব রইল কোথায় ? কারণ তখন তো সকল মানুষই এ মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। সুতরাং এখানে হাফেযে কোরআনই উদ্দেশ্য। পাঠকারী হাফেয তার হেফযকৃত অংশ তিলাওয়াত করে এক পর্যায়ে শেষ করে বিরতি দেয় ও থামে। এ ভাবে তার মর্যাদার আসন ও তিলাওয়াত করে সমাপ্তকৃত আয়াতের শেষ প্রান্তে।
(৪) হাফেযে কোরআনকে সম্মানের মুকুট ও মর্যাদার পোশাক পরানো হবে। এবং মহান আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :—
কিয়ামতের দিবসে কোরআন এসে বলবে হে আমার প্রতিপালক : একে (হাফেয) পোশাক পরিধান করাও। তখন মর্যাদার মুকুট পরানো হবে। এর পর বলবে হে মালিক, আরো পরাও। তখন তাকে সম্মানের পোশাক পরানো হবে। অত:পর (কোরআন) বলবে : হে পরওয়ারদেগার, তুমি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। তখন বলা হবে : পড়তে থাক এবং মর্যাদার ধাপে উন্নীত হতে থাক এবং তাকে প্রত্যেক অক্ষরের বিনিময়ে নেকি বাড়িয়ে দেয়া হবে। (তিরমিজি শরীফ)
(৫) কোরআন মজিদ মুখস্থ করা মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতার উৎকৃষ্ট ও পবিত্র আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং প্রশংসিত ঈর্ষণীয় ক্ষেত্র বা বস্তু। নবী সা. বলেছেন –
একমাত্র দুই ব্যক্তির উপর ঈর্ষা করা যায়। এক ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা কোরআনের জ্ঞান দান করেছেন, সে দিবা রাত্রি ঐ কোরআন পড়তে ও অন্যকে শিখাতে ব্যস্ত থাকে। দ্বিতীয় সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ দান করেছেন। সে তা দিনরাত (বৈধ কাজে) খরচ করে। (বুখারী, মুসলিম)
অপরের নেয়ামত দেখে সেটি ধ্বংস ও নি:শেষ হয়ে যাওয়ার কামনা না করেই নিজের মধ্যে অর্জন করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করাকে ঈর্ষা বলা হয়। আর হিংসা বলা হয়-
কারো নেয়ামত দেখে তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কামনা করা। এবং অন্তর জ্বালায় ভুগতে থাকা।
কোরআন মুখস্থ করার এতসব মর্যাদা ও সম্মান ; তাই সংগত কারণেই সকল মুসলমানের উচিত হবে স্বীয় ক্ষমতা ও শক্তি অনুযায়ী কোরআন মুখস্থ করার এ মহৎ কাজে অংশ গ্রহণ করা। পূর্ণ কোরআন না হোক অন্তত যেটুকু পারা যায় সেটুকুই হোক। একে বারে কিছু না হওয়ার চেয়ে অল্প হোক তাও ভাল। এক্ষেত্রে সর্ব প্রথম ও প্রধান আদর্শ হচ্ছেন স্বয়ং রাসূলে কারীম সা.-যিনি সর্ব প্রথম কোরআন মুখস্থকারী। অত:পর তার সাহাবিবৃন্দ রা. যাদের মধ্যে অনেক হাফেয ছিলেন। কেউ পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছেন আবার কেউ কিছু অংশ।
বিরে মাউনার যুদ্ধেই তাদের সত্তরজন শহীদ হয়েছেন আর নবুয়্যতের ভণ্ড দাবিদার মুসাইলামাতুল কাযযাব-এর সাথে সংঘটিত ইয়ারমুক লড়ইয়ের আরো সত্তরজন। বিশেষ করে বর্তমান যুগে মুখস্থ করা কত সহজ হয়েছে, যা বিগত দিনে তাদের যুগে ছিল না। বর্তমানে সুন্দর সুন্দর ছাপার কুরআন রয়েছে বাজারে। হেফযের প্রশিক্ষকগণ অধিকহারে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন প্রতি নিয়ত। এছাড়া আরো বহু সুযোগ সুবিধা রয়েছে। যা কোরআন মুখস্থ করাকে অতি সহজ করে দিয়েছে। তাই আমাদের সকলেরই এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া দরকার। এতে করে আমাদের হৃদয় আল্লাহর ইবাদত দ্বারা আবাদ থাকবে।
এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এ বিষয়ে আমাদের সন্তানদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়া এবং তাদেরকে কোরআন মুখস্থ করানোর বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কেননা ছোটরা মুখস্থর ক্ষেত্রে বড় ও বয়স্কদের চেয়ে অধিক সামর্থ্যবান। প্রবাদ আছে :
ছোট বয়সে মুখস্থ করা যেমন পাথর খোদাই করে চিত্রাঙ্কন করা। এ বয়সে তাদের মন মস্তিষ্ক থাকে পরিষ্কার। সময় পায় প্রচুর। অবসরে থাকে বিস্তর সময়। তা ছাড়া আমরা তাদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য দায়িত্বশীল।

 

আসসালামু আলাইকুম ইসলামিক দলিল ভিত্তিক পোস্ট পেতে আমাদের এই মিডিয়ার সাথে থাকবেন সব সময়। এতে করে সঠিক টা জানতে পারবেন ও সঠিক আমল করতে পারবেন।আমাদের পেজ লিংক দেয়া আছে ওয়েবসাইট এ সেখানে চাইলে যেকোন প্রশ্ন করতে পারবেন। ইনশাআল্লাহ আমাদের এডমিন পেনেল আপনার উত্তর দলিল সহকারে দেয়ার চেস্টা করবেন। জাজাকাল্লাহু খাইরান

Print Friendly, PDF & Email

২ thoughts on “কোরআন পড়ার ও মুখস্ত করার ফযীলাত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Skip to toolbar